শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

বাজারে রমযানের অগ্রিম প্রভাব

রমযান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিত্যপণ্যের দাম কমানো হলেও আমাদের দেশ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ, এই মোবারক মাস আসার সাথে সাথেই আমাদের দেশের একশ্রেণির অসাধু ও অতি মুনাফাখোর অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে ওঠে। তারা বাজার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অযৌক্তিক ও অনাকাক্সিক্ষতভাবে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করে। ফলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় এবং রোজাদাররা রোজা পালনে সমস্যায় পড়েন। এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা অঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেও জনগণের ভোগান্তির কথা মাথায় রাখে না। সরকারও এদের কাছে রীতিমত অসহায়। মাঝে মাঝে সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে হম্বিতম্বি করলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না।  ফলে বাজারের নিয়ন্ত্রণের এসব কুশিলবরা নির্বিবাদে চালিয়ে যায় তাদের অপকর্ম ও অপতৎপরতা। 

এবার এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা অগ্রিম তৎপরতা শুরু করেছে বলেই মনে হচ্ছে। রমযান শুরু হতে এখনও প্রায় ৪ মাস বাকি রয়েছে। তবে এর মধ্যেই বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি রীতিমত শুরু হয়ে গেছে। সে ধারাবাহিকতায় বাড়ানো হয়েছে রমযানের নিত্যপণ্য ছোলার দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে পণ্যটি ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ৭ দিনের ব্যবধানে সব ধরনের ভোজ্যতেলের দামও বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে আলু বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা। তবে আরেক দফা কমেছে ডিমের দাম। রাজধানীর বাজার সংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকে এমন তথ্যই জানাচ্ছেন। বিক্রেতারা বলছেন, এদিন খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ছোলা মানভেদে বিক্রি হয় ১৩০-১৪০ টাকা। যা ৭ দিন আগে বিক্রি হয়েছে ১২৫-১৩০ টাকা। সপ্তাহের ব্যবধানে এই পণ্যটির দাম বেড়েছে ৫-১০ টাকা। খুচরা বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, আড়তদার ও পাইকাররা ৪ মাস আগেই রোজার এ পণ্যটি নিয়ে কারসাজি শুরু করেছে।

মূলত, এক প্রকার নীরবে-নিভৃতেই বাড়ানো হয়েছে রমযান কেন্দ্রিক পণ্য ছোলার দাম। গত কয়েক বছরও এমন চিত্রই দেখা গেছে। তবে এবার বাজারে রমযানের অগ্রিম প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলেই মনে হচ্ছে। তাই রোজায় ক্রেতাকে স্বস্তি দিতে এখন থেকেই সার্বিকভাবে বাজারে তদারকি জোরদার করা দরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোজার কয়েকদিন আগে তদারকি শুরু করলে কোনো লাভ হয় না। কারণ, অসাধু সিন্ডিকেট রোজার ৩ থেকে ৪ মাস আগেই পণ্যের দাম বাড়ায়। তাই এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

আমাদের দেশের অনিয়ন্ত্রিত বাজার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবং আসন্ন রমযানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর খুচরা বাজারে ৭ দিনের ব্যবধানে সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। বিক্রেতারা জানান, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৬৫ টাকা। যা ৭ দিন আগেও ১৬০ টাকা ছিল। বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৬৭-১৭০ টাকা। যা এক সপ্তাহ আগেও ১৬৫-১৭০ টাকা ছিল। এছাড়া দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ টাকা। যা ৭ দিন আগেও ৩৩৫ টাকা ছিল। পাশাপাশি খোলা পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৫৬ টাকা। যা এক সপ্তাহ আগেও ১৫০ টাকা ছিল। আর পাম অয়েল সুপার বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৬০ টাকা। যা আগে ১৫৪ টাকা ছিল। সর্বপরি খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার বোতলজাত রাইসব্রান তেল বিক্রি হচ্ছে ২০০-২১০ টাকা। যা এক সপ্তাহ আগে লিটারপ্রতি বিক্রি হয়েছে ১৮৫-১৯৫ টাকা। সঙ্গে পাঁচ লিটারের বোতলজাত রাইসব্রান তেল বিক্রি হচ্ছে ৯৮০-১০৫০ টাকা। যা ৭ দিন আগেও ৮৮০-৯২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, বিশ্ববাজারে দাম কমছে। আমদানিতেও সরকার শুল্ক ছাড় করছে। তারপরও দেশের বাজারে কোম্পানিগুলো ভোজ্যতেলের দাম কমাচ্ছে না বরং বাড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে রোজা ঘিরে এই দাম আরও বাড়াবে।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাবেক সভাপতি গোলাম রহমানের বক্তব্য হলো, মূল্যস্ফীতির হার কমাতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তেলসহ একাধিক পণ্যের আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। ডলারের দাম কমানো ও এলসি মার্জিন তুলে নেওয়া হয়েছে। এতে আমদানির খরচ কমলেও বাজারে দাম কমছে না। কেন কমছে না সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। এখানে কোনো ধরনের কারসাজি থাকলে অসাধুদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

এদিকে খুচরা বাজারে ছোলা ও ভোজ্যতেলের সঙ্গে আলুর দাম আরেকদফা বেড়েছে। খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। যা এক সপ্তাহ আগেও প্রতি কেজি খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৬৫ টাকা। তবে কমেছে ডিমের দাম। গত সপ্তাহে প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হয়েছে ৫২ টাকা। যা বৃহস্পতিবার বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। প্রতি কেজি ছোট দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকা, মাঝারি দানার মসুর ডাল ১২০ ও মোটা দানার মসুর ডাল ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রমযান মাস রহমত ও আত্মশুদ্ধির মাস হলেও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায় এ মাসকে ব্যবসার মাস হিসাবে মনে করেন। তারা বিভিন্ন ধরনের কারসাজি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে বাজারে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। শুরু হয় জনদুর্ভোগ। তাই এদের ষড়যন্ত্র, কারসাজি বন্ধ করে রমযানে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে এখন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এদের শাস্তির আওতায় আনতে প্রয়োজনেরআইন সংশোধন করাও জরুরি। অন্যথায় আসন্ন রমযানের রোজাদারদের সিয়াম পালন মোটেই স্বস্তিদায়ক হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ